Image Description

আমাদের দাদা সাদেক খান

990.00
($25.00, £18.00)
Format Hardcover
Language Bangla
ISBN 9789842006159
Edition 1st
Pages 368

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের উদীয়মান বাঙালি মধ্যবিত্তের শিক্ষিত তরুণ অংশকে সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবমুক্ত করে আধুনিক ও অগ্রসরমান চিন্তা ও কাজের সঙ্গে যুক্ত করার কাজে তার অবদানের কথা তেমন জানেন না। শুধু রাজনৈতিক নয়, তার সাংস্কৃতিক চিন্তাধারাও ছিল প্রথাবিরোধী, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল। তার এই ভূমিকা একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মধ্যবিত্ত বাঙালির তরুণ প্রজন্মকে সাম্প্রদায়িকতার মোহমুক্ত হওয়ার কাজে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট, অমর একুশের গানের রচয়িতা সাদেক মূলত অসম্ভব অস্থির চিত্তের মানুষ ছিল। তার মাথার ভেতরে একসাথে অনেক কিছু কাজ করত। যখন যেটা করত পাগলের মতো করত এবং সেখানে তার আধুনিক মননশীলতা ছাপ রেখে যেত। ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও সাদেক খুবই আধুনিক মনের মানুষ ছিল এবং জীবনকে উপভোগ করত। মুর্তজা বশীর। কবি, কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, মুদ্রাবিদ। সাদেক ভাই বিতর্ক ভালোবাসতেন, কখনো ধৈর্য হারাতেন না, প্রকাশে উষ্মা প্রকাশ ছিল তাঁর অজানা। বিতর্কে এই জ্ঞানী মানুষটিকে পরাজিত করা সহজ ছিল না। ফারুক চৌধুরী। কুটনীতিক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব During the Liberation War, Sadeq Khan worked with the government in exile and was informally assigned for logistic support and external publicity, keeping connection with the Sector Commanders and cultural activists. He also worked for mobilising global support in favour of the war of independence Sayed Kamaluddin. Editor, Weekly Holiday জেল থেকে বেরুনোর পরপরই কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে সাদেক খান আত্মগোপনে চলে যান। কঠিন জীবনযাত্রা, পর্যাপ্ত খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে সাদেক খান যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘ চিকিৎসা নিয়ে তিনি পরবর্তীতে যক্ষ্মা থেকে সুস্থ হলেন বটে, তবে তার শিক্ষাজীবনে ব্যাপক ক্ষতি হয়। জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসক ও ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র আমাদের জন্য দুঃখের বিষয় এই যে আমরা একজন প্রতিভাবান পদার্থবিদ অথবা গণিত শাস্ত্রবিদের কাছ থেকে বঞ্চিত হলাম। কারণ তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর চালিয়ে যেতে পারলেন না। রাজনীতির কারণে তাঁকে যেতে হয়েছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে। ক্লাসরুমে বসার চেয়ে মানবমুক্তির সংগ্রামকে অধিকতর প্রয়োজনীয় বলে বেছে নিয়েছিলেন। হায়দার আকবর খান রনো। রাজনীতিক, লেখক, সাবেক ছাত্রনেতা বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার কূটচাল আর স্থানীয় সমাজপতিদের ছলে-বলে বিক্ষত-বিভাজিত বঙ্গভূমির আর্তচিৎকারে প্রকৃতই যে চৈতন্যোদয় হয়েছিল সে কালের শিরোনাম বায়ান্ন। যেন শতবছর ধরে খুঁজে চলা স্বাধীনতার কক্ষপথ খুঁজে পায়- বাংলাদেশ। মুখে মায়ের ভাষা আর বুকে অমিত তেজ নিয়ে বাংলার অসংখ্য সন্তান মাতৃভূমির দীর্ঘযুগের অপমান আর পরাধীনতার অবসান চায়। এই আকাক্সক্ষায় আমাদের যে অগ্রজরা মেধা আর সাহসে, শ্রমে আর সৃষ্টিশীলতায় সময়ের অনুপ্রেরণা হয়েছেন, অন্যদেরকে আকৃষ্ট করেছেন, তাদের একজন সাদেক খান। বর্তমান বাংলাদেশের যা-কিছু কাঠামো ততটুকুর চূড়ান্ত ভিত্তি নির্মিত হয়েছে ৫০’র দশকে। বিদ্রোহের সুর, অন্নের যোগান, বেসাতির কায়দা, শিল্পের ছোঁয়া বা জ্ঞানের সংশ্লেষণ, জাতিরাষ্ট্রের জন্ম-বিকাশের পথে বিশাল কর্মযজ্ঞের ঐ দূরন্ত সময়ে এক দ- বসে ছিলেন না সাদেক খান। আন্দোলনের সংগঠক, শিল্পের কারিগর, উদ্যোক্তা বা বিদ্বান-এই সকল উপাধি তার গায়ে যুতসই-এমন কথা তার নিন্দুকেরাও তাই স্বীকার করেন দ্বিধাহীন চিত্তে। যৌবনের সেই উন্মাদনা সাদেক খানকে পরবর্তী জীবনে ভাসিয়েছে অলক্ষ্যের লক্ষ্যে। বিপুলা জীবনের নানা রং যখন তিনি গায়ে মাখিয়েছেন তখন আমরা বিস্মিত হয়েছি, বিস্মৃত হয়েছি। যদিও তিনি তাতে ভ্রুক্ষেপ করেননি। যৌবনেই তিনি জীবন বৈচিত্র্যের রস আস্বাদন করেছিলেন। পরিবারের প্রাসাদ ছেড়ে রেল লাইনের দু’ধারে ঘুমিয়েছেন সমান পৃথিবীর আশায়। নতুনের প্রতি ছিল তীব্র আকর্ষণ। শৃঙ্খলায় পরাধীন ভাবতেন নিজেকে। জীবনকে ‘পারফরমিং আর্ট’ হিসেবে গ্রহণ করে যাপন করতে চেয়েছিলেন। চিত্রনির্মাতা, অভিনেতা, পুঁজিপতি-ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, শিল্প সমালোচক, মুক্তিযোদ্ধা, সমাজগবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী বা নির্মোহ সাধারণ মানুষ ইত্যাদি চরিত্রসমূহ তিনি উপস্থাপন করেছেন অনায়াস পারঙ্গমতায়। জগতটাকে বুঝতে চেয়েছিলেন যুক্তি দিয়ে, জীবন যাপন করেছেন খেয়ালে। তবে মানুষ আর প্রকৃতির প্রতি নির্মোহ এক প্রেমের আলোতে তার যুক্তি ও খেয়ালের সংঘর্ষ হয়নি কখনো। যুক্তির দায়িত্বে সাদেক খান পরিবারের “বড় দাদা”। আবার মনের খেয়ালে দূরে এক নির্জন জীবন শিল্পী। রাজনীতি সচেতন সমাজ সংলগ্ন এই মানুষটির মত-পথের বিভিন্নতায় অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, বাম থেকে ডানের দোদুল্যতার কারণে তাকে দূরে ঠেলে দেয়া যেতে পারে। তবে জীবনের প্রতি আমুদে স্বভাব, বিনয়-বিদ্যার সহজ প্রকাশ আর সৃজনশীল মনন বৈশিষ্ট্য সাদেক খানকে উদ্ভাসিত করেছে অন্য আলোয়। এ সংকলনে নানা মাত্রার লেখা ও ছবির মাধ্যমে সাদেক খানের যে প্রতিকৃতি অঙ্কিত হয়েছে বিশেষভাবে তাঁর অসমাপ্ত আত্মস্মৃতি, তাঁর পরিবারের নানা বয়সের পরিজনদের লেখা, তাঁর প্রিয় বন্ধুদের লেখা, আর তাঁর চিন্তা বিকাশের অসংখ্য লেখা থেকে নিজস্বতার কিছু চুম্বক লেখা। আমরা এই সংকলনে গ্রন্থিত করেছি। আশা করি সকল শ্রেণির পাঠক তা থেকে একটা নিজস্ব ধারণা ও মতামত গড়ে তুলতে পারবেন এই সংকলনে।

Sadeq Khan / সাদেক খান

পুরো নাম : আবু সৈয়দ মোহাম্মদ সাদেক খান, চলতি নাম : সাদেক খান, পারিবারিক নাম : চিনু, জন্ম : ২১ জুন ১৯৩২, সার্টিফিকেট জন্মতারিখ, ১ জানুয়ারি ১৯৩২ মুন্সীগঞ্জ, পিতা : জাস্টিস আব্দুল জব্বার খান (মরহুম) সাবেক স্পিকার, পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি, মাতা : সালেহা খানম (মরহুমা)শিক্ষা: পদার্থবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র ও সংখ্যাতত্ত্বে স্নাতক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫৫ অন্যান্য প্রশিক্ষণ :যন্ত্রসঙ্গীতে (বেহালা ও হাওয়াইয়ান গিটার) : বুলবুল একাডেমি কোর্স। চলচ্চিত্রে (প্রযোজনা,পরিচালনা ও অভিনয়): (১৯৫৭-১৯৬১) এজে কারদারের আন্তর্জাতিক আর্ট ফিল্ম (ঢাকা) ইউনিটে শিক্ষাপ্রাপ্ত। ফ্লাহার্টি ফাউন্ডেশনে (আমেরিকা, ১৯৬৩) স্বাভাবিক জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে শিক্ষাপ্রাপ্ত। চিত্রশিল্পে :জয়নুলআবেদিন-কামরুল হাসান-হামিদুর রহমানের সংস্পর্শে ও অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের সহায়তায় নন্দনতত্ত্ব, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা বিষয়ক অধ্যয়ন (১৯৫৩-৫৭)। ঢাকায় কর্মশালায় আগত জন ফ্রেঞ্চের কাছে স্থাপত্য সৌন্দর্য সম্পর্কে দীক্ষা (১৯৫৭)। সাহিত্যে: (১৯৪৮-৫০) প্রগতি সাহিত্য সংঘে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে কবিতা ও গদ্য রচনার নিয়মিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও জ্ঞান লাভ। রাজনৈতিক জীবন : পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ঢাকা জেলা কমিটির সম্পাদক এবং সেই হিসেবে পার্টি থেকে ভাষা আন্দোলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ভাষাসৈনিক : ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সাংগঠনিক নেতৃত্বের ভূমিকায় লিপ্ত হয়ে কেন্দ্রীয় সংগ্রাম কমিটির শেষ সভা থেকে গ্রেপ্তার হন এবং একমাস কারাবাস করেন। সেখানে যক্ষ্মা জীবাণু প্লুরিসি আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যগত কারণে কারামুক্তি লাভ করেন। কিন্তু শয্যাশায়ী অবস্থায় দু’বছর কাটাতে হয় বলে শিক্ষায় ছেদ পড়ে। ডবল অনার্স কোর্স বাদ দিয়ে আরও এক বছর পর স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবন সংবাদ ভাষ্যকার : ১৯৫৫-৫৭ সাল। স্নাতক পরীক্ষা দিয়েই ‘সংবাদ’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক ডেস্কে কাজের জন্য আবেদন করেন। রচনায় দক্ষতাদৃষ্টে সরাসরি সহ-সম্পাদক পদে নিয়োগ লাভ করেন। চারুশিল্প সমালোচক : ১৯৫৭-৫৯। এজে কারদারের চলচ্চিত্র ইউনিটে যোগদানের জন্য ‘সংবাদে’ অনিয়মিত লেখক হিসেবে ছাড় নিয়ে নেন। ঢাকার পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় শিল্প সমালোচক হিসেবে অনিয়মিত প্রতিবেদনেরও সুযোগ পান। চলচ্চিত্রকার : ১৯৬০-৬২। এজে কারদারের অসম্পূর্ণ আর্ট ফিল্ম ‘দূর হ্যায় সুখ কি গাঁও’ এবং মহীউদ্দিন আহমদের বিনোদন চলচ্চিত্র ‘রাজা এল শহরে’ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। একই সময় সরকারের শ্রম দপ্তর এবং সড়ক ও গৃহনির্মাণ দপ্তরের জন্য দুটো প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেন। ১৯৬২ সাল। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে একটা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানী দলের কাজের চিত্রগ্রহণের জন্য বিল গুথ নামের একজন পিসকোর ভলান্টিয়ারের সঙ্গে যুক্তভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৬২-৬৩ সাল। ছয় মাসের জন্য আমেরিকায় পিসকোর ভলান্টিয়ারদের বাংলা শিক্ষক নিযুক্ত হন। সেখানে ফ্লাহার্টি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে এবং মাইকেল ফন ইঙ্গেন নামের একজন দক্ষিণ এশিয়াবান্ধব ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৯৬৩-৬৬ সাল। মাইকেল ফন ইঙ্গেনের সামান্য বৈদেশিক অর্থসাহায্যে হুমায়ুন কবীরের ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়ন স্বত্বলাভ করেন এবং বিল গুথকে চিত্রগ্রাহক নিযুক্ত করে আর্ট ফিল্ম প্রযোজনা ও পরিচালনার স্বনির্ভর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে অর্থায়নের অংশীদার নিয়ে ‘লুব্ধক’ এই নামের একটা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গঠন করে দুটো পূর্ণাঙ্গ বিনোদন চলচ্চিত্র ও ১৬টি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের প্রযোজনায় লিপ্ত হন। সেজন্য পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র পরিচালনায় ‘চিত্রালী’ সম্পাদক সৈয়দ পারভেজকে এবং প্রামাণ্য চলচ্চিত্র পরিচালনায় এদেশে অবস্থানরত ফরাসি সফর তথ্য লেখক এম. বুস্কেকে নিয়োগদান করেন চিত্রশালা: উল্লেখ্য, আমেরিকা যাত্রার পূর্বে মরহুম জাস্টিস আবু সাঈদ চৌধুরীকে সভাপতি করে সাদেক খান আর্টস এনসেম্বল গ্যালারি নামে একটা চিত্রশালা স্থাপন করেন, একজন সদ্য স্নাতক চিত্রশিল্পীকে সাথে রেখে বুস্কে সেই গ্যালারিরও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেটাই ছিল বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চিত্রশালা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সরকারের শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত সেটা চালু রাখা হয়। শিল্পোদ্যোক্তা: ১৯৬৬-৭০ সাল। আর্ট ফিল্মের খরচ উঠে এলেও এবং প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে লাভ করা সম্ভব হলেও বাণিজ্যিক পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হন। সেই ক্ষতিপূরণের জন্য গুন্থার নামের এক জার্মান কারিগরকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে মোটর মেরামত এবং অতঃপর লোহা ঢালাই করে যন্ত্রাংশ ও লোহার পাত জুড়ে পাইপ নির্মাণের কারখানা স্থাপন করেন। স্ট্যান্ডার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ নামে এই কারখানা থেকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) প্রথম স্থানীয়ভাবে নির্মিত উচ্চচাপের পাম্প উৎপাদন এবং তুর্কি কারিগর আমদানি করে প্রথম মোটা গ্যাস পাইপলাইনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অংশ (ভৈরব স্টিল ব্রিজ সংলগ্ন) নির্মাণ করেন। স্থানীয়ভাবে একটি প্রকল্প সহযোগিতা ও কারিগরি কোম্পানি করে স্থানীয় প্রযুক্তি দিয়ে চট্টগ্রাম স্টিল মিলে এদেশে প্রথম জিপি শিট উৎপাদন করেন। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ঠিকাদারির যোগ্যতা অর্জন করে মেঘনা-ধনাগোদা প্রকল্পের দুটো শাখানদীর পথ পরিবর্তনের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভূগর্ভ প্রোথিত পাম্প নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করে আনেন। একই সঙ্গে আধা অংশীদারিত্বে একটা ট্যানারি ক্রয় করেন ১৯৭০ সালে। সর্বাধিক দেশীয় আধা ট্যান করা চামড়া রপ্তানি করেন। মুক্তিযোদ্ধা : ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে প্রথমে ফেনীতে প্রতিরোধ সংঘঠনে লিপ্ত হন এবং সেখান থেকে খগড়াছড়ি রামগড় টি এস্টেটে জিয়াউর রহমানের যুদ্ধশিবিরে প্রেরিত হন। জিয়াউর রহমান কর্তৃক কিছু সংবাদ বহন করার দায়িত্বে ত্রিপুরায় খালেদ মোশাররফের শিবিরে প্রেরিত হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামারুজ্জামানের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধাদের আর্কাইভপ্রধান নিযুক্ত হন এবং সেই সুবাদে বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধের সংবাদের জন্য সফররত হন। অক্টোবর মাসে ৪টি সেক্টরের কমান্ডার কর্তৃক জাস্টিস আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে প্রেরিত হন এবং নিজস্ব উদ্যোগে ফরাসি দেশে আঁদ্রে মালরোঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত হওয়ায় স্বতন্ত্র যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ প্রচেষ্টা পরিত্যক্ত হলে তখন বিলেতে প্রচারাভিযানে নিযুক্ত হন। যুদ্ধজয়ের পর ৭২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় ফিরে আসেন। ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠাতা-ট্রাস্টে একজন অবৈতনিক ট্রাস্টি নিযুক্ত হন। প্রবাস জীবন : ১৯৭২-৮২ সাল। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের অপরাধে ইতোমধ্যে তার কোম্পানিগুলোর শেয়ার জব্দ, ঠিকাদারি বাতিল ও ব্যাংক সুবিধাদি জবরদস্তি বাতিল করে দখলদার পাকিস্তান সরকার তাকে আবার দেনাদারে পরিণত করেছিল। সরকারের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো ক্ষতিপূরণ বা নতুন ব্যবসায়ে সহযোগিতা না পেয়ে ১৯৭৪ সালে ব্যবসা গুটিয়ে সপরিবারে লন্ডন প্রবাসী হন। সেখানে বাংলা কাগজে লেখালেখি এবং বসতবাড়ি-দোকান ইত্যাদি লিজ কেনাবেচা ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে ডলার কেনাবেচা করে ব্যয় নির্বাহ করেন। ঐতিহ্য ও উন্নয়ন গবেষক : ১৯৮২-৮৪। প্রবাসী জীবনে নিয়োজিত থেকেও ‘হলিডে’ পত্রিকায় নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ও ভাষা বিকাশে সুফী প্রভাব, মুসলিম কৃষক চেতনা এবং পূর্ববঙ্গীয় স্থানীয় সরকার নেতৃত্বের অভ্যুদয় সম্পর্কে একটি গবেষণামূলক ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ১৯৮৫ সাল। সপরিবারে উত্তর আমেরিকা সফরে গিয়ে সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের মধ্যে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বেসরকারি উদ্যোগ ও বিকল্প কৌশল সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনায় ও কর্মে প্রবৃত্ত হন। প্রত্যাবর্তন ও কর্মজীবন: ১৯৮৬-৮৭ সাল। এক বছরের জন্য ‘হলিডে’ পত্রিকার অস্থায়ী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের আমন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে দক্ষিণ পারমাণবিক অস্ত্র প্রযুক্তির প্রতিযোগিতার বিষয়ে প্রকাশিত সংকলনে তাঁর সুচিন্তিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। জাপানে একটি উন্নয়ন তাত্ত্বিক সম্মেলনে সাংবাদিক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৮-৯০ সাল। নিজ ব্যয়ে ‘রূপায়ণ (প্রযুক্তি ও প্রতিকার) গবেষণা’ নামে একটি পাঠকেন্দ্র স্থাপন করে উপকূলীয় ভূমি উদ্ধার, খনিজ তেল, গ্যাস, পানি পরিবেশ, দেশজ পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে গবেষণায় লিপ্ত হন। ঐসব বিষয়ে এবং চারুশিল্প সমালোচনায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার সারগর্ভ রচনা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন। একই সঙ্গে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯১-৯৬ সাল। নিজ ব্যয়ে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে প্রথম ইরাক অবরোধ ও আক্রমণের প্রাক্কালে বাগদাদে বোমা হামলার আগের দিন সেখানে পৌঁছেন এবং জাতিসংঘ শরণার্থী হয়ে দেশে ফেরেন। ১৯৯২ সালে তাঁর গবেষণালব্ধ উপাত্তসহ রচনা ভারতে প্রকাশের জন্য কলকাতার মওলানা আবুল কালাম ইনস্টিটিউট আয়োজিত সেমিনারে পেশ করেন। তাতে বাংলাদেশি শরণার্থীর চাপ ভারতের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অপবাদ খ-ন করে তিনি বাংলাদেশের সমুদ্রে বিরাট সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজের বিশেষ সংখ্যায় একই উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের বাসভূমি বিস্তারের অধিকার ও স্বনির্ভর সম্ভাব্যতা সম্পর্কে তাঁর মৌলিক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৬-২০০১ সাল। আমেরিকায় আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে দেশে-বিদেশে সেমিনার, সম্মেলন ও নদী ব্যবস্থাপনায় জৈব পরিবেশের ও নদীস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার প্রচারে ব্রতী হন। ২০০২-১০ সাল। রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। কলাম লেখার চর্চা অব্যাহত রেখে ‘হলিডে’ ও অন্যান্য পত্রিকায় নিয়মিত এবং অন্যান্য অনেক পত্র-পত্রিকায় অনিয়মিত প্রবন্ধ লেখেন। তা ছাড়া রেডিও, টেলিভিশন ও সেমিনারে জাতীয় সমস্যাদি, জাতীয় সম্পদ, নিরাপত্তা, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক বিষয়াদিতে মৌলিক বক্তব্যদান করেন। সমাজসেবা সংশ্লিষ্টতা: ১৯৭২ থেকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি, আমৃত্যু বোর্ডের সভাপতি। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক চেয়ারম্যান। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ফরাসি বিশ্বসংস্থা আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ-এর ঢাকাস্থ পরিচালক সভার অবৈতনিক প্রেসিডেন্ট। আর্থসামাজিক গবেষণা ও গণসংযোগ প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল বাংলা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ও অবৈতনিক প্রেসিডেন্ট। মৃত্যু : ১৬ মে, ২০১৬, বারিধারা, ঢাকা।